বাংলাদেশ থেকে মুনাফা ও লভ্যাংশ বিদেশে পাঠানোর নিয়ম: বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের আইনি গাইড

By Sufia Shefa25 Oct 2026Business & Investment
বাংলাদেশ থেকে মুনাফা ও লভ্যাংশ বিদেশে পাঠানোর নিয়ম: বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের আইনি গাইড

বাংলাদেশে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ নিজ দেশে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া, প্রযোজ্য কর, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের (AD Bank) মাধ্যমে রেমিট্যান্সের ধাপগুলো জানুন।

বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের অর্জিত লভ্যাংশ (Dividend) নিজ দেশে ফেরত নেওয়া (Repatriation) একটি সুনির্দিষ্ট ও অনুমোদিত আইনি প্রক্রিয়া। নির্ধারিত কর পরিশোধের পর বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের প্রাপ্য চূড়ান্ত ও অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক (Authorised Dealer/AD Bank) এর মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো যায়।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত Foreign Exchange Regulation Act, 1947, Foreign Private Investment (Promotion and Protection) Act, 1980, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪, আয়কর আইন, ২০২৩ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের Guidelines for Foreign Exchange Transactions (GFET) অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

🏢 লভ্যাংশ বিদেশে পাঠানোর ৫টি প্রধান ধাপ

১. নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতকরণ:

কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর বিধান অনুযায়ী লভ্যাংশ কেবল কোম্পানির অর্জিত বণ্টনযোগ্য মুনাফা থেকেই ঘোষণা করা যায়। প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরীক্ষা (Audit) করাতে হয়। AD ব্যাংক ও কর কর্তৃপক্ষের নিকট নিরীক্ষিত হিসাবের সত্যতা প্রমাণের জন্য Document Verification Code (DVC) যুক্ত রিপোর্ট সংযুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক।

২. বোর্ড সুপারিশ ও সাধারণ সভায় লভ্যাংশ ঘোষণা:

কোম্পানি আইনের নিয়মানুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors) লভ্যাংশের সুপারিশ করে এবং বার্ষিক সাধারণ সভায় (AGM) তা অনুমোদিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশের ক্ষেত্রে কোম্পানির সংঘবিধি (Articles of Association) অনুযায়ী বোর্ড সরাসরি তা ঘোষণা করতে পারে। এসময় বোর্ড রেজোলিউশন, এজিএম কার্যবিবরণী ও আরজেএসসি (RJSC)-তে দাখিলকৃত হালনাগাদ শেয়ারহোল্ডার রেজিস্টার প্রস্তুত রাখতে হয়।

৩. উৎসে কর কর্তন ও চালান জমা:

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২১ অনুযায়ী লভ্যাংশ বিতরণের পূর্বে নির্ধারিত হারে উৎসে কর (TDS) কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (DTAA) থাকলে, সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারের Tax Residency Certificate ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সনদ সাপেক্ষে হ্রাসকৃত হারে কর কর্তন করা যায়।

৪. AD ব্যাংকে আবেদন ও নথি পেশ:

Foreign Exchange Regulation Act, 1947 ও বাংলাদেশ ব্যাংকের GFET (Volume-1) নির্দেশনা অনুযায়ী কোম্পানি যে ব্যাংকে লেনদেন করে, সেখানে নিরীক্ষক কর্তৃক প্রত্যয়িত ফরম (Form A2/Auditor's Certificate), অডিট রিপোর্ট, বোর্ড ও এজিএম রেজোলিউশন, ট্যাক্স চালান এবং প্রাথমিক মূলধন আনায়নের Encashment Certificate দাখিল করতে হয়।

৫. রেমিট্যান্স সম্পাদন ও রেকর্ড সংরক্ষণ:

নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই শেষে AD ব্যাংক বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের বৈদেশিক ব্যাংক হিসাবে লভ্যাংশ পাঠিয়ে দেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্টিং সম্পন্ন করে। বিকল্প হিসেবে, লভ্যাংশ বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের বাংলাদেশে রক্ষিত নন-রেসিডেন্ট বৈদেশিক মুদ্রা একাউন্টেও জমা করা যায়। পরবর্তীতে ব্যাংকের রেমিট্যান্স অ্যাডভাইস ও কর চালান অডিট ও কর নির্ধারণের জন্য সংরক্ষণ করতে হয়।

 অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকসমূহ

  • শেয়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ (FEID Circular 01/2026): বাংলাদেশ ব্যাংকের FEID Circular No. 01 (08 March 2026) অনুযায়ী, অনালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক শর্তপূরণ সাপেক্ষে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত নিজ দায়িত্বে প্রসেস করতে পারে। মনে রাখবেন, এটি কেবল শেয়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ বা মূলধন প্রত্যাবাসনের সীমা; নিয়মিত লভ্যাংশ প্রেরণের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো আর্থিক সীমা প্রযোজ্য নয়।

  • শাখা ও লিয়াজোঁ অফিসের মুনাফা: শাখা অফিস (Branch Office)-এর মুনাফা স্থানান্তরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন লাগে। অন্যদিকে, লিয়াজোঁ অফিস (Liaison Office) কোনো বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের আইনি এখতিয়ার রাখে না।

  • ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিপালন: Value Added Tax and Supplementary Duty Act, 2012 অনুযায়ী ভ্যাট রিটার্ন এবং আয়কর আইন অনুসারে কোম্পানির নিজস্ব আয়কর রিটার্ন হালনাগাদ না থাকলে লভ্যাংশ প্রেরণে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

মূল বিনিয়োগটি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে এসেছে কি না, ব্যাংক তা সবসময় পরীক্ষা করে। তাই শুরু থেকেই ইনওয়ার্ড এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা এবং করপোরেট রিটার্ন ও অডিট নিয়মিত হালনাগাদ রাখলে লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন অতি দ্রুত ও সহজে সম্পন্ন করা যায়।


এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো আইনি মতামত নয়। আপনার পরিস্থিতিতে কোন আইন ও অনুমোদন প্রযোজ্য, তা জানতে EMA.LEGAL-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।


Need help with this topic?

Our advocates and ITPs handle tax, VAT and company matters every day. Send your question and we will call you back.

Your details are confidential and will only be used to respond to your enquiry.

Related articles

বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি গঠনের প্রক্রিয়া

বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি গঠনের প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কীভাবে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধন করবেন? জেনে নিন RJSC নিবন্ধনের ৫টি প্রধান ধাপ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বৈদেশিক মূলধন স্থানান্তর, BIDA অনুমোদন এবং কোম্পানি নিবন্ধন-পরবর্তী কর, ভ্যাট ও কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।

BIDA রেজিস্ট্রেশন কিভাবে করবেন? বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রয়োজন কেন?

BIDA রেজিস্ট্রেশন কিভাবে করবেন? বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রয়োজন কেন?

Bangladesh Investment Development Authority (BIDA) সরকারের বিনিয়োগ উন্নয়নকারী সংস্থা। এখানে রেজিস্ট্রেশন করলে আপনার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে…

Talk to a lawyer about your tax or company matter