বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি গঠনের প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আগ্রহী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য Private Limited Company Registration in Bangladesh একটি প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামো। সংরক্ষিত অল্প কয়েকটি খাত (যেমন: প্রতিরক্ষা বা পারমাণবিক শক্তি) বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০০% বিদেশি মালিকানায় অথবা বিদেশি- স্থানীয় যৌথ উদ্যোগে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তবে ব্যবসায়িক পরিধি ভেদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সামনে প্রধানত তিনটি বিকল্প থাকে— পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য পরিচালনায় প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, মূল বিদেশী কোম্পানির সম্প্রসারণ হিসেবে ব্রাঞ্চ অফিস (Branch Office), এবং কেবল বাজার গবেষণা ও যোগাযোগের জন্য লিয়াজোঁ অফিস (Liaison / Representative Office).
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (Companies Act, 1994) অনুযায়ী, যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের পরিদপ্তর (RJSC)-এর মাধ্যমে কোম্পানি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। তবে শুধু নিবন্ধন করাই যথেষ্ট নয়; বিদেশি বিনিয়োগের অর্থ স্থানান্তর, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদনও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে কোম্পানি গঠনের ৫টি প্রধান ধাপ
১. ব্যবসার খাত ও কোম্পানির কাঠামো নির্ধারণ
প্রথমে যাচাই করুন, আপনার নির্বাচিত খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে কি না এবং বিশেষ লাইসেন্স, অনাপত্তিপত্র (NOC) বা সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন কি না। এরপর শেয়ারহোল্ডার, পরিচালক, মালিকানার অনুপাত এবং অনুমোদিত মূলধন (Authorised Capital) ও পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) নির্ধারণ করুন।
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী কোম্পানির কাঠামো ও সাংগঠনিক নথি প্রস্তুত করতে হবে। বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে Foreign Private Investment (Promotion and Protection) Act, 1980-ও প্রাসঙ্গিক।
২. কোম্পানির নামের ছাড়পত্র
পরবর্তী ধাপে RJSC-এর নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত কোম্পানির নামের ছাড়পত্র (Name Clearance) নিতে হবে। নামটি আগে থেকে নিবন্ধিত থাকলে বা অনুমোদনের উপযুক্ত না হলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। তাই বিকল্প নাম প্রস্তুত রাখা ভালো।
৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত
কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য Memorandum of Association (MoA), Articles of Association (AoA), পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য, পাসপোর্টের কপি, নিবন্ধিত কার্যালয়ের ঠিকানা এবং RJSC নির্ধারিত অন্যান্য নথি প্রস্তুত করতে হবে।
বিদেশি শেয়ারহোল্ডার কোনো কোম্পানি হলে তার নিবন্ধন সংক্রান্ত নথি ও বোর্ড রেজল্যুশনও প্রয়োজন হতে পারে। বিদেশে সম্পাদিত নথির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী নোটারি, অ্যাপোস্টিল বা অন্যান্য সত্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে।
৪. সাময়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন স্থানান্তর (Inward Remittance)
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য প্রাথমিক পেড-আপ ক্যাপিটাল (Paid-up capital) হিসেবে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশি মুদ্রা আনা আবশ্যক। এর জন্য RJSC-তে নিবন্ধনের আগেই যেকোনো স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রস্তাবিত কোম্পানির নামে একটি 'Temporary Non-Resident Taka Account' খুলতে হয়। এই অ্যাকাউন্টে ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে প্রেরিত মূলধন ব্যাংক টাকায় রূপান্তর (Encash) করে একটি Encashment Certificate প্রদান করে, যা RJSC-তে নিবন্ধনের আবেদনপত্রের (Online Submission) সাথে বাধ্যতামূলক নথি হিসেবে জমা দিতে হয়। যদিও আইনিভাবে কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা নেই, তবে কোম্পানি অনুমোদনের পরে উক্ত একাউন্ট রেগুলার একাউন্ট হিসেবে গন্য হয়।
৫. RJSC-তে কোম্পানি নিবন্ধন
প্রয়োজনীয় আবেদনপত্র, MoA, AoA এবং অন্যান্য নথি RJSC-তে (Online) জমা দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি ও প্রযোজ্য স্ট্যাম্প ডিউটি পরিশোধ করতে হবে। আবেদন অনুমোদিত হলে RJSC থেকে Certificate of Incorporation ইস্যু করা হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানি একটি পৃথক আইনগত সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কোম্পানি নিবন্ধনের পর করণীয়
কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী নিচের আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করতে হবে:
ট্রেড লাইসেন্স ও e-TIN: ব্যবসার কার্যক্রম শুরু এবং করসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় নিবন্ধন সম্পন্ন করুন। কোম্পানির আয়কর ও রিটার্নসংক্রান্ত দায়িত্ব আয়কর আইন, ২০২৩ (Income Tax Act, 2023) অনুযায়ী পালন করতে হবে।
VAT নিবন্ধন (BIN): ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ (Value Added Tax and Supplementary Duty Act, 2012) অনুযায়ী VAT নিবন্ধন ও রিটার্নসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালন করুন।
ব্যাংক হিসাব: কোম্পানির নামে করপোরেট ব্যাংক হিসাব খুলে প্রযোজ্য ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধিবিধান অনুসরণ করুন।
BIDA (বর্তমানে Invest Bangladesh) -এর নিবন্ধন বা অনুমোদন: বিনিয়োগের ধরন, প্রযোজ্য সুবিধা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা অনুমোদন নিন।
বিদেশি কর্মীর ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট: বিদেশি নাগরিক নিয়োগের আগে প্রযোজ্য ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিশ্চিত করুন।
IRC/ERC: আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম থাকলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ (IRC) বা রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ERC) সংগ্রহ করুন।
বার্ষিক কমপ্লায়েন্স: RJSC-তে প্রযোজ্য বার্ষিক রিটার্ন, বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM), হিসাবরক্ষণ এবং কর রিটার্নের বাধ্যবাধকতা যথাসময়ে পালন করুন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
Invest Bangladesh-এর প্রকাশিত ইনভেস্টর ভিসা (PI VISA) কিংবা ওয়ার্ক পারমিট নির্দেশনায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা ব্যয় হিসেবে ন্যূনতম ৫০,০০০ মার্কিন ডলারের ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের Encashment Certificate প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এটি RJSC- তে কোম্পানি নিবন্ধনের সার্বজনীন ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের সাথে সম্পর্কিত নয়। সংশ্লিষ্ট আবেদন ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শর্তটি প্রযোজ্য কি না, তা আগে যাচাই করা উচিত।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক ব্যবসায়িক কাঠামো নির্বাচন, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে মূলধন স্থানান্তর, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ এবং করপোরেট কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনা ও নথিপত্র প্রস্তুত রাখলে নিবন্ধন-পরবর্তী জটিলতা কমানো সম্ভব। তবে Branch Office, Liaison / Representative Office নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ভিন্ন, যা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আইনে বিবেচিত নয়।
এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো আইনি মতামত নয়। আপনার পরিস্থিতিতে কোন আইন ও অনুমোদন প্রযোজ্য, তা জানতে EMA.LEGAL-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

