বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: বাংলাদেশে সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনার নিয়ম

বিদেশে অবস্থান করেও বাংলাদেশে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি মাধ্যম। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ ও বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী বিদেশ থেকে সঠিকভাবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর করার প্রধান ৫টি মূল ধাপ—দলিলের ধরন নির্ধারণ থেকে শুরু করে দূতাবাস সত্যায়ন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত গাইডলাইন জানুন এই নিবন্ধে।
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক, প্রবাসী পরিবার কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে না এসেও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি একটি কার্যকর আইনি মাধ্যম, যার মাধ্যমে তাঁরা অন্য কাউকে নির্দিষ্ট কাজ করার আইনগত ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন । এটি মূলত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা, ২০১৫ দ্বারা পরিচালিত । পাশাপাশি স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ ও রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর বিধান সাপেক্ষে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর করার প্রধান ৫টি ধাপ
১. পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ধরন নির্ধারণ
কাজের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে দলিলের ধরন নির্বাচন করতে হয়:
অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Irrevocable Power of Attorney): জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি, বিক্রয় চুক্তি, সম্পত্তি বন্ধক রাখা বা জমি উন্নয়নের মতো কাজের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক।
সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (General Power of Attorney): : ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, বাড়ি বা দোকানের ভাড়া আদায়, মামলা পরিচালনা এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের জন্য এ ধরনের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়া হয়।
২. স্পষ্ট খসড়া ও ক্ষমতার পরিধি প্রস্তুত
দলিল দাতা ও গ্রহীতার পরিচয় ও কী কী কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে মৌজা, দাগ ও খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ এবং মালিকানার উৎস সঠিকভাবে উল্লেখ করা আবশ্যক। প্রয়োজনে দলিলের মেয়াদ এবং একাধিক ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেওয়া হলে তাঁদের প্রত্যেকের দায়িত্বও আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে |
৩. বিদেশে দলিল সম্পাদন ও কনস্যুলার সত্যায়ন
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিককে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটে উপস্থিত হয়ে কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসই দিতে হবে একই সঙ্গে দলিলের সঙ্গে সংযুক্ত ছবি সত্যায়ন করতে হবে। আইন অনুযায়ী, যিনি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিচ্ছেন, তাঁকে যিনি ক্ষমতা গ্রহণ করছেন তাঁর ছবিতেও স্বাক্ষর করতে হবে। পরিচয় প্রমাণের জন্য পাসপোর্টের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য: অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের তৈরি দলিল নোটারাইজ করার পর Apostille সত্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
৪. বাংলাদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন ও স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২-এর ধারা ৬ অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA) থেকে সত্যায়ন করাতে হবে।এরপর স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের (কালেক্টর) কার্যালয়ে দলিল জমা দিয়ে প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। দলিলটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর তারিখ থেকে ৩ (তিন) মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় সত্যায়ন ও স্ট্যাম্পিংয়ের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
৫. রেজিস্ট্রেশন ও স্থানীয় অনুমোদন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ক্ষেত্রে কালেক্টর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর দলিলটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠানো হয়। এরপর রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী দলিলটি নিবন্ধন করা হয়।অন্যদিকে, সম্পত্তি যদি রাজউক (RAJUK) বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (CDA) আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত হয়, তাহলে দলিল নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।
দলিল কার্যকরের পর করণীয় ও আইনি সুরক্ষা
দায়িত্ব ও নথি সংরক্ষণ: গ্রহীতা দলিলে নির্ধারিত ক্ষমতার বাইরে কাজ করতে পারবে না। আইনত তাঁর সম্পাদিত কাজ দাতার নিজস্ব কাজ হিসেবে গণ্য হবে। মূল সত্যায়িত ও স্ট্যাম্পকৃত দলিল নিরাপদ হেফাজতে রাখা জরুরি।
কোম্পানি ও ব্যাংকিং লেনদেন:কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রাজউক (RAJUK), RJSC বা BIDA-সংক্রান্ত কাজ পরিচালনার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়া হলে, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বোর্ড রেজুলেশনের (Board Resolution) কপি সংযুক্ত করতে হবে।
কর ও ব্যাংকিং বাধ্যবাধকতা: গ্রহীতার মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি বা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ দাতার আয়কর রিটার্নে আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি, লেনদেনের অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ ও পরিশোধ করা উত্তম।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রত্যাহার: সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করতে চাইলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২-এর ধারা অনুযায়ী গ্রহীতাকে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ৩০ (ত্রিশ) দিনের লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে।
বিদেশে বসেই সঠিক নিয়মে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি ও প্রয়োজনীয় সত্যায়ন সম্পন্ন করলে বাংলাদেশে আপনার সম্পত্তি ও ব্যবসার কাজ সহজেই বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারবেন
এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো আইনি মতামত নয়। আপনার পরিস্থিতিতে কোন আইন ও অনুমোদন প্রযোজ্য, তা জানতে EMA.LEGAL-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।


