উৎসে কর (TDS) যাচাইয়ে কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা: ধারা ১৪৭ কী বলছে?

বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪৭ অনুযায়ী উৎসে কর (TDS) যাচাইয়ে কর কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন, ডিজিটাল রেকর্ড পরীক্ষা ও নথিপত্র জব্দের ব্যাপক ক্ষমতা এবং অসহযোগিতায় সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধনীসহ ধারা ১৪৭-এর ক্ষমতা, জরিমানার ঝুঁকি ও প্রতিষ্ঠানের আইনি পরিপালন গাইডলাইন জানুন এই নিবন্ধে।
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উৎসে কর (Tax Deducted at Source – TDS) কর্তন, সংগ্রহ ও সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দায়িত্ব। তবে শুধু উৎসে কর কর্তন করলেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ হয় না; সংশ্লিষ্ট হিসাব ও নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও জরুরি।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪৭ অনুযায়ী, উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের যথার্থতা যাচাই করার জন্য কর কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬ সালের অর্থ আইনেও এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
১. কর কর্তৃপক্ষের কী কী ক্ষমতা রয়েছে?
ধারা ১৪৭(১) অনুযায়ী, কর কমিশনার অথবা মহাপরিচালক (পরিদর্শন) বা মহাপরিচালক (কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল) কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ উৎসে কর যাচাইয়ের জন্য নিম্নলিখিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন:
যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অফিস, ব্যবসায়িক প্রাঙ্গণ, পণ্য, হিসাববই ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড পরিদর্শন করতে পারবেন।
কম্পিউটার বা ডিজিটাল সিস্টেমে সংরক্ষিত এনক্রিপ্টেড তথ্য পাঠযোগ্য করতে পারবেন।
ইলেকট্রনিক রেকর্ড ও সিস্টেম থেকে তথ্য, ছবি এবং অন্যান্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড ভেঙে কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারবেন।
হিসাববই, দলিলপত্র ও ডিজিটাল তথ্যের কপি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
প্রয়োজন অনুযায়ী হিসাববই, দলিলপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড ও সিস্টেম জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারবেন।
এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ, মূল্য নির্ধারক বা বাহিনী সঙ্গে নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।
২. যাচাই কার্যক্রমে বাধা দিলে কত টাকা জরিমানা হতে পারে?
ধারা ১৪৭(২) অনুযায়ী, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলে, প্রবেশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে অথবা প্রবেশের পর নির্ধারিত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বাধা, প্রতিবন্ধকতা বা অসহযোগিতা করলে তাকে সর্বোচ্চ ৫০ (পঞ্চাশ) লাখ টাকা জরিমানা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু প্রবেশের সময় নয়, পরিদর্শন চলাকালীন অসহযোগিতাও জরিমানার আওতাভুক্ত।
৩. আইন না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে ?
ধারা ১৪৭(৩) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এই ধারার বিধান মেনে চলতে ব্যর্থ হলে, উপকর কমিশনার তার দেওয়া ব্যাখ্যা বিবেচনা করে কর নির্ধারণ করতে পারবেন। আর ওই ব্যক্তি কোনো ব্যাখ্যা না দিলে, উপকর কমিশনার একতরফাভাবেও কর নির্ধারণ করতে পারবেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত কর ও জরিমানা আদায় করা যাবে।
৪. কত বছরের হিসাব যাচাই করতে পারবে NBR?
ধারা ১৪৭(৪) অনুযায়ী, NBR সংশ্লিষ্ট অর্থবছর এবং তার আগের সর্বোচ্চ ২টি অর্থবছরের হিসাব যাচাই করতে পারবে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩টি অর্থবছরের হিসাব যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।
এই বিধানটি অর্থ আইন, ২০২৬-এর ধারা ৮৪(খ) দ্বারা সংযোজন করা হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
৫. প্রতিষ্ঠানের করণীয় কী?
আইনগত জটিলতা ও জরিমানার ঝুঁকি এড়াতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত:
নিয়মিত TDS/TCS হিসাব ও রেজিস্টার সংরক্ষণ করা।
উৎসে কর কর্তনের চালান ও সরকারি কোষাগারে জমার প্রমাণ রাখা।
সংশ্লিষ্ট বিল, ভাউচার, চুক্তিপত্র ও ব্যাংক লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ করা।
উৎসে করের সনদ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।
কর কর্তৃপক্ষের আইনসম্মত যাচাই কার্যক্রমে সহযোগিতা করা।
গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
ধারা ১৪৭ মূলত উৎসে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আইনগত পরিপালন নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাই প্রতিষ্ঠানের মালিক, পরিচালক, CFO এবং Accounts Department-এর উচিত নিয়মিত TDS Compliance নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখা।
এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো আইনি মতামত নয়। আপনার পরিস্থিতিতে কোন আইন ও অনুমোদন প্রযোজ্য, তা জানতে EMA LEGAL- এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।


